লাল সবুজ বর্ণান্ধতা: কারণ, ধরন ও দৈনন্দিন জীবন
ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত প্রতি ১২ জন পুরুষের মধ্যে প্রায় ১ জন লাল ও সবুজ আলাদা করতে সমস্যায় পড়েন। লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কেন হয়, এর কী কী ধরন আছে, কিভাবে বংশে আসে এবং এ নিয়ে কিভাবে স্বচ্ছন্দে বাঁচা যায় – জেনে নিন।
সূচিপত্র
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কী?
লাল-সবুজ বর্ণান্ধতায় চোখের রেটিনার যে আলো-সংবেদী কোষগুলো লাল ও সবুজ রঙ শনাক্ত করে, সেগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে। আক্রান্তরা রঙ দেখেন ঠিকই, কিন্তু কিছু রঙ একই রকম লাগে: লাল ও সবুজ, কমলা ও হলদে-সবুজ, বাদামি ও গাঢ় সবুজ, কিংবা গোলাপি ও ধূসর। একে কালার ব্লাইন্ড বলা হলেও বেশিরভাগ মানুষ আসলে রঙের প্রতি অন্ধ নন – তাঁরা কেবল কিছু রঙ কম স্পষ্টভাবে দেখেন।
এটি সবচেয়ে সাধারণ রঙ দেখার সমস্যা। উত্তর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে প্রায় ৮% পুরুষ ও ০.৫% নারী এতে আক্রান্ত।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতার কারণ
রেটিনায় তিন ধরনের কোন কোষ (cone) আছে – দিনের আলোয় রঙ দেখার কোষ। প্রতিটি ধরন আলোর বর্ণালির একটি অংশে সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয়: ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য (নীল, "S"), মাঝারি (সবুজ, "M") ও দীর্ঘ (লাল, "L")। মস্তিষ্ক এদের সংকেত তুলনা করে রঙ বোঝে।
লাল-সবুজ বর্ণান্ধতায় লাল অথবা সবুজ কোন কোষ পরিবর্তিত থাকে বা একেবারেই থাকে না। এদের সংবেদনশীলতার বক্ররেখা কাছাকাছি চলে আসে, ফলে মস্তিষ্ক লাল ও সবুজ সংকেতের মধ্যে কম পার্থক্য পায় – আর রঙ দুটো আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতার ধরন: প্রোটান ও ডিউটান
| ধরন | কী আলাদা? | হার (পুরুষ, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত) |
|---|---|---|
| ডিউটেরানোমালি (সবুজ-দুর্বলতা) | সবুজ কোন কোষ সরে গেছে | প্রায় ৫% |
| ডিউটেরানোপিয়া (সবুজ-অন্ধতা) | সবুজ কোন কোষ নেই | প্রায় ১% |
| প্রোটানোমালি (লাল-দুর্বলতা) | লাল কোন কোষ সরে গেছে | প্রায় ১% |
| প্রোটানোপিয়া (লাল-অন্ধতা) | লাল কোন কোষ নেই | প্রায় ১% |
"-অ্যানোমালি" ধরনে তিন ধরনের কোন কোষই থাকে, তবে একটি সরে যায় – সমস্যা মৃদু, মাঝারি বা তীব্র হতে পারে। "-অ্যানোপিয়া" ধরনে এক ধরনের কোন কোষ পুরোপুরি অনুপস্থিত। প্রোটান ধরনের একটি সাধারণ লক্ষণ: লাল রঙ গাঢ়ও দেখায়, তাই লাল ট্রাফিক লাইট বা গাড়ির পেছনের বাতি কম উজ্জ্বল মনে হয়।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কি বংশগত?
জন্মগত লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা X-সংযুক্ত প্রচ্ছন্ন (রিসেসিভ) উপায়ে বংশে আসে। লাল ও সবুজ কোন রঞ্জকের জিন X ক্রোমোজোমে থাকে। পুরুষের একটিই X ক্রোমোজোম – জিন পরিবর্তিত হলে তিনি আক্রান্ত হন। নারীর দুটি X থাকে, আর সুস্থ কপিটি সাধারণত পরিবর্তিত কপির ঘাটতি পূরণ করে। তাই পুরুষেরা অনেক বেশি আক্রান্ত হন।
স্বাভাবিক
লাল-সবুজ বর্ণান্ধ
স্বাভাবিক
বাহক
- মা বাহক হলে প্রতিটি ছেলের বর্ণান্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%।
- বর্ণান্ধ বাবা জিনটি সব মেয়েকে দেন (তারা বাহক হয়), কিন্তু কোনো ছেলেকে দেন না।
- একজন নারী তখনই আক্রান্ত হন যখন তাঁর দুটি X ক্রোমোজোমেই জিনটি থাকে।
কম ক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে রঙ দেখা বদলে যায় – চোখ বা অপটিক নার্ভের রোগ থেকে, কিংবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়। হঠাৎ রঙ দেখায় পরিবর্তন টের পেলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কিভাবে পরীক্ষা করবেন
সবচেয়ে পরিচিত স্ক্রিনিং হলো ইশিহারা টেস্ট: রঙিন বিন্দু দিয়ে তৈরি সংখ্যা বিন্দুর নকশার মধ্যে লুকানো থাকে, আর লাল-সবুজ বর্ণান্ধরা কিছু সংখ্যা দেখতে পান না বা অন্য সংখ্যা পড়েন। আপনি এখানে বিনামূল্যে অনলাইনে টেস্টটি দিতে পারেন। পূর্ণ নির্ণয়ের জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞরা অ্যানোমালোস্কোপের মতো যন্ত্রও ব্যবহার করেন, যা সমস্যার তীব্রতা মাপে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই স্কুলে ধরা পড়ে – দেখুন শিশুদের কালার ব্লাইন্ড টেস্ট।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কি ভালো হয়?
জন্মগত লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা সারানো যায় না এবং সারা জীবন একই থাকে। জিন থেরাপি নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে এখনো সহজলভ্য নয়। তবে সহায়ক উপায় আছে: কালার ব্লাইন্ড চশমা অনেকের জন্য লাল ও সবুজের কনট্রাস্ট বাড়াতে পারে, যদিও স্বাভাবিক রঙ দেখা ফিরিয়ে দেয় না।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা নিয়ে দৈনন্দিন জীবন
- পোশাক: লেবেল ব্যবহার করুন বা আলমারি রঙের পরিবার অনুযায়ী সাজান।
- খাবার: ফল পেকেছে কিনা, মাংস কতটা রান্না হয়েছে বা খাবারে সস আছে কিনা বোঝা কঠিন হতে পারে।
- চার্ট ও স্ট্যাটাস লাইট: শুধু লাল/সবুজের বদলে প্রতীক, নকশা বা লেবেল চেয়ে নিন।
- মোবাইল: iOS ও Android-এর অ্যাক্সেসিবিলিটি সেটিংসে প্রোটান ও ডিউটানের জন্য কালার ফিল্টার আছে।
- গাড়ি চালানো: ট্রাফিক লাইটের অবস্থান দেখেও সংকেত বোঝা যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্সে রঙ দেখার শর্ত দেশভেদে আলাদা – নিজের দেশের নিয়ম জেনে নিন।
কিছু পেশায় – যেমন পাইলট, ইলেকট্রিশিয়ান বা সামরিক বাহিনীর কিছু পদে – স্বাভাবিক রঙ দেখা প্রয়োজন হতে পারে। এমন পেশার লক্ষ্য থাকলে আগেভাগেই রঙ দেখা পরীক্ষা করিয়ে নিন।
আসলে দেখতে কেমন লাগে জানতে চান? পড়ুন কালার ব্লাইন্ড মানুষ কিভাবে দেখে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কতটা সাধারণ?
উত্তর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৮% পুরুষ ও ০.৫% নারী আক্রান্ত – মোটামুটি প্রতি ১২ জন পুরুষে ১ জন।
পুরুষেরা কেন বেশি কালার ব্লাইন্ড হন?
জিনগুলো X ক্রোমোজোমে থাকে। পুরুষের একটি, নারীর দুটি X – নারীদের ক্ষেত্রে সুস্থ কপিটি সাধারণত ঘাটতি পূরণ করে।
লাল সবুজ বর্ণান্ধতা কি সময়ের সাথে বাড়ে?
জন্মগত ধরন সারা জীবন একই থাকে। হঠাৎ রঙ দেখায় পরিবর্তন চোখের রোগের লক্ষণ হতে পারে, তাই ডাক্তার দেখানো উচিত।
কালার ব্লাইন্ড হলে কি গাড়ি চালানো যায়?
অনেক দেশে যায়, তবে নিয়ম দেশভেদে আলাদা – বিশেষ করে বাণিজ্যিক লাইসেন্সের ক্ষেত্রে। নিজের দেশের নিয়ম জেনে নিন।